হজ পরিচিতি ও ইতিহাস :
হজের পরিচয় : হজ (حج) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা করা বা সংকল্প করা। ইসলামী শরীআতের পরিভাষায় মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্টস্থান তথা কাবা শরীফ ও সংশ্লিষ্ট স্থান সমূহ জিয়ারত করার নাম হজ।
إِنَّ أَوَّلَ بَيتٍ وُضِعَ لِلنّاسِ لَلَّذي بِبَكَّةَ مُبارَكًا وَهُدًى لِلعالَمينَ
নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হিদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য
আল ইমরান-৯৬
فيهِ آياتٌ بَيِّناتٌ مَقامُ إِبراهيمَ وَمَن دَخَلَهُ كانَ آمِنًا وَلِلَّهِ عَلَى النّاسِ حِجُّ البَيتِ مَنِ استَطاعَ إِلَيهِ سَبيلًا وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ العالَمينَ
তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।
আল ইমরান- ৯৭
إِنَّ الصَّفا وَالمَروَةَ مِن شَعائِرِ اللَّهِ فَمَن حَجَّ البَيتَ أَوِ اعتَمَرَ فَلا جُناحَ عَلَيهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِما وَمَن تَطَوَّعَ خَيرًا فَإِنَّ اللَّهَ شاكِرٌ عَليمٌ
নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে কিংবা উমরা করবে তার কোন অপরাধ হবে না যে, সে এগুলোর তাওয়াফ করবে। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কল্যাণ করবে, তবে নিশ্চয় শোকরকারী, সর্বজ্ঞ।
আল বাকারা-:১৫৮
وَأَتِمُّوا الحَجَّ وَالعُمرَةَ لِلَّهِ فَإِن أُحصِرتُم فَمَا استَيسَرَ مِنَ الهَديِ وَلا تَحلِقوا رُءوسَكُم حَتّى يَبلُغَ الهَديُ مَحِلَّهُ فَمَن كانَ مِنكُم مَريضًا أَو بِهِ أَذًى مِن رَأسِهِ فَفِديَةٌ مِن صِيامٍ أَو صَدَقَةٍ أَو نُسُكٍ فَإِذا أَمِنتُم فَمَن تَمَتَّعَ بِالعُمرَةِ إِلَى الحَجِّ فَمَا استَيسَرَ مِنَ الهَديِ فَمَن لَم يَجِد فَصِيامُ ثَلاثَةِ أَيّامٍ فِي الحَجِّ وَسَبعَةٍ إِذا رَجَعتُم تِلكَ عَشَرَةٌ كامِلَةٌ ذلِكَ لِمَن لَم يَكُن أَهلُهُ حاضِرِي المَسجِدِ الحَرامِ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعلَموا أَنَّ اللَّهَ شَديدُ العِقابِ
আর হজ ও উমরা আল্লাহর জন্য পূর্ণ কর। অতঃপর যদি তোমরা আটকে পড় তবে যে পশু সহজ হবে (তা যবেহ কর)। আর তোমরা তোমাদের মাথা মুন্ডন করো না, যতক্ষণ না পশু তার যথাস্থানে পৌঁছে। আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ কিংবা তার মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে তবে সিয়াম কিংবা সদাকা অথবা পশু যবেহ এর মাধ্যমে ফিদয়া দেবে। আর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন যে ব্যক্তি উমরার পর হজ সম্পাদনপূর্বক তামাত্তু করবে, তবে যে পশু সহজ হবে, তা যবেহ করবে। কিন্তু যে তা পাবে না তাকে হজে তিন দিন এবং যখন তোমরা ফিরে যাবে, তখন সাত দিন সিয়াম পালন করবে। এই হল পূর্ণ দশ। এই বিধান তার জন্য, যার পরিবার মাসজিদুল হারামের অধিবাসী নয়। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ আযাবদানে কঠোর।
আল বাকারা-১৯৬
الحَجُّ أَشهُرٌ مَعلوماتٌ فَمَن فَرَضَ فيهِنَّ الحَجَّ فَلا رَفَثَ وَلا فُسوقَ وَلا جِدالَ فِي الحَجِّ وَما تَفعَلوا مِن خَيرٍ يَعلَمهُ اللَّهُ وَتَزَوَّدوا فَإِنَّ خَيرَ الزّادِ التَّقوى وَاتَّقونِ يا أُولِي الأَلبابِ
হজের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ আরোপ করে নিল, তার জন্য হজে অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। আর তোমরা ভাল কাজের যা কর, আল্লাহ তা জানেন এবং পাথেয় গ্রহণ কর। নিশ্চয় উত্তম পাথেয় তাকওয়া। আর হে বিবেক সম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর।
আল বাকারা-১৯৭
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: "مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ، رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ".
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ করে এবং হজ্জের সময় কোনো পাপ বা অশ্লীল কাজ করে না, সে হজ্জ থেকে এমনভাবে ফিরে আসে যেন সে তার মায়ের গর্ভ থেকে সদ্য জন্ম নিয়েছে।”
(সহিহ বুখারি: ১৫২১, সহিহ মুসলিম: ১৩৫০)
হজের হুকুমত গুরুত্ব :
ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে হজ হচ্ছে পঞ্চম। সামর্থবানদের উপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। এটা হচ্ছে আর্থিক ও দৈহিক ইবাদত। তাই সুনির্দিষ্ট শর্তসমূহ পূরণ হলেই হজ ফরজ হয়। এ ফরজকে অস্বীকার করা কুফরী। তাই কোন মুসলমান এ ফরজকে অস্বীকার করলে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায়। ফরজ মেনে নিয়ে আদায় না করলে সে ফাসিক।
যে বছর হজ ফরজ হয় ঐ বছরেই তা আদায় করা ফরজ। ওযর ছাড়া বিলম্ব করলে গুনাহগার হবে। তাই বিনা ওযরে বিলম্ব করা জায়িয নয়। তবে জীবদ্দশায় আদায় করতে পারলে ফরজ আদায় হয়ে যাবে। আদায় না করে মারা গেলে তার জিম্মায় হজ বাকী থেকে যাবে। হজ ফরজ হওয়ার পর সে কায়িকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে অন্য কারো দ্বারা হজ করানো ফরজ যাকে বদলী হজ বলা হয়। এভাবেও আদায় না হলে অন্য কারো দ্বারা হজ আদায় করানোর অসিয়ত করে যাবে। মৃত্যুর পূর্বে এভাবে অসিয়ত করে যাওয়ার তার উপর ফরজ। এভাবে অসিয়ত না করলে সে গুনাহগার হবে। হজ ফরজ হওয়ার পর যদি আদায় করার সময় পাওয়া না যায় অথবা হজের পথে মারা যায় তাহলে তার উপর আর ফরজ থাকবে না। সে ফরজ মাফ হয়ে যাবে।
হজ আখিরাতের স্তর সমূহের বাস্তব নমূনা। হজ আখিরাতের একটি বাস্তব চিত্র যেন আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। আত্মীয় স্বজন থেকে বিদায় নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া যেন মৃত্যুর সময় আপনজনসহ সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার মত। যানবাহনে আরোহন করার মাধ্যমে হাজীকে মায়্যিতের খাটিয়র উপর সওয়ার হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ইহরামের দু’টুকরা সাদা কাপড় যেন মায়্যিতের কাপনের কাপড়। কা’বা শরীফের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা হাশরের দিন আরশে আজীমের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাফা ও মারওয়ার মাঝে দৌড়াদৌড়ি হাশরের ময়দানে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করার মত। ৯ই যিলহজ আরাফাতের ময়দানে লক্ষ লক্ষ হাজীর অবস্থান হাশরের ময়দানে সকল মানুষের অবস্থানের সাথে তুলনীয়। এভাবে হাজীগণের সামনে আখিরাত ভ্রমণের একটি চিত্র ভেসে উঠে।
হজ হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালবাসা প্রকাশ করার এক অপরূপ দৃশ্য। হজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ মুসলিমের পরস্পরের সাক্ষাতের মাধ্যমে উদ্দীপ্ত হবার ঠিকানা। হজ মুসলিমগণের সর্ববৃহৎ বিশ্বে সম্মেলন। বিশ্বের আলিম ও ফকীহবৃন্দ একত্রিত হয়ে সম্মিলিত ভাবে বিভিন্ন বিষয়ে উদ্ভূত সমস্যা সমূহের সমাধান দেওয়ার সুযোগ পান এ হজে। হজ হলো মুসলিম উম্মাহর এক বৃহত্তম প্রদর্শনী। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর অনৈক্য দূর হয়ে যায় এবং এর প্রভাব ও গৌরব চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
Copyright© Al Mabrur Hajj KafelaAll right reserved. Created by E-Vision Software Ltd