হজের নিয়মাবলীঃ
হজ ফরজ হওয়ার শর্তাবলী :
নিম্মোক্ত শর্তসমূহ একত্রিত হলেই হজ ফরজ হয় :
১. মুসলমান হওয়া,
২. জ্ঞানবান হওয়া,
৩. বালিগ তথা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া,
৪. স্বাধীন হওয়া (গোলাম না হওয়া),
৫. আর্থিক দিক থেকে হজ পালনের সক্ষমতা অর্জন করা,
৬. হজ ফরজ হওয়ার ইলম বা জ্ঞান থাকা
৭. হজের সময় হওয়া।
হজ আদায় ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলী :
নিম্মোক্ত শর্তসমূহ পাওয়া গেলে হজ আদায় করা ওয়াজিব হয় :
১. শারীরিক সুস্থতা,
২. রাস্তাঘাট নিরাপদ হওয়া,
৩. কারাবন্দী না হওয়া,
৪. হজ আদায়কারী মহিলা হলে তার সাথে স্বামী বা অন্য কোন মাহরাম আত্মীয় থাকা,
৫. মহিলাদের জন্য ইদ্দত
হজের ফরজ সমূহ :
হজের ফরজ :
১.
ইহরাম বাঁধা : ইহরাম আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে হারাম করা বা
নিষিদ্ধ করা। হজ ও ওমরা পালনেচ্ছু ব্যক্তি যখন ইহরাম বেঁধে হজ অথবা ওমরা
আদায় করার নিয়্যতে তালবিয়া পাঠ করেন তখন তাদের উপর কতিপয় হালাল এবং মুবাহ
কাজ ও হারাম হয়ে যাওয়ার কারণে একে বলা হয় ইহরাম। আবার ইহরাম অবস্থায়
পুরুষের জন্য ব্যবহৃত চাদর দু’টিকেও ইহরাম বলা হয়। হজ অথবা ওমরার নিয়্যত
করে কমপক্ষে একবার তালবিয়া পাঠ করলে ইহরাম বাঁধা গণ্য হয়।
২.
উকূফে আরাফা বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা : জিলহজ মাসের নবম তারিখ
সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে ১০ই জিলহজের সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন
সময়ে এ তাওয়াফ আদায় করতে হ। ১০ই জিলহজ জামরায় কংকর নিক্ষেপ করে এবং
প্রয়োজনে কুরবানী আদায় করে মাথার চুল ছাঁটা বা মাথা মুন্ডানোর পর থেকে এ
তাওয়াফ শুরু হয়। উপরোক্ত ফরজ তিনটির মধ্যে প্রথমটি অর্থাৎ ইহরাম বাঁধা হজের
শর্ত। পরবর্তী দু’টি অর্থাৎ উকূফে আরাফাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুকন।
উপরোক্ত ফরজ তিনটির কোন একটি বাদ পড়লে হজ হবে না। দম বা কুরবানী দিলেও হজ
আদায় হবে না।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা।
হজের ওয়াজিব সমূহ :
১.
মুযদালিফায় অবস্থান করা, ৯ই জিলহজ দিবাগত রাত্রে সুবহে সাদিক থেকে
সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য হলেও মুযদালিফায় অবস্থান করা
ওয়াজিব।
২. সাফা-মারওয়ায় সায়ী করা,
৩. রমী করা, (জামরা সমূহে কংকর নিক্ষেপ করা),
৪. হজে তামাত্তু ও হজে কিরান আদায়কারী হলে কুরবানী করা, (এর অপর নাম দমে শুকরিয়া)
৫. মাথার চুল মুন্ডানো অথবা ছোট করা,
৬. মীকাতের বাইরের হাজীগণের বিদায়ী তাওয়াফ করা,
হজের সুন্নাত সমূহ :
১.
মীকাতের বাইরে অবস্থানকারীদের মধ্যে যারা হজে ইফরাদ অথবা হজে কিরান করেন
তাদের জন্য তাওয়াফে কুদূম করা। তাওয়াফে কুদূমে রমল করা। এই তাওয়াফে রমল না
হলে তাওয়াফে যিয়ারত অথবা বিদায়ী তাওয়াফে রমল করা।
২. সাফা ও মারওয়ার মধ্যে যে দু’টো সবুজ বাতির স্তম্ভ আছে এর মধ্যবর্তী স্থান দ্রুতগতিতে চলা, তবে তা মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
৩. মক্কা মুকাররমায় ৭ই জিলহজ, ৯ই জিলহজ আরাফাত ও মিনায় ১১ই জিলহজ ইমামের
৪. ৯ই জিলহজ সূর্যোদয়ের প মিনা থেকে আরাফারে উদ্দেশ্যে রওয়ানা করা।
৫. উকুফে আরাফার জন্য গোসল করা।
৬. আরাফাত থেকে ফেরার পথে মুযদালিফায় রাত্রে অবস্থান করা।
৭. ১০ই জিলহজ সূর্যোদয়ের সামান্য পূর্বে মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হওয়া।
৯. তিন জামরাতে কংকর নিক্ষেপের সময় তারতীব ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সুন্নাত বাদ পড়লে দম ওয়াজিব হয় না।
হজের আদব ও মুস্তাহাব সমূহঃ
১. ইস্তিখারা করা (সুনির্দিষ্ট অনুযায়ী)।
২. হজের সফরে অভিজ্ঞতা আছে এমন লোকের সাথে পরামর্শ করা।
৩. সমুদয় কজ পরিশোধ করা।
৪. খালিস নিয়্যতে ও শর্তাবলী পূরণ করে আল্লাহর নিকট তাওবা করা।
৫. কেবল মহান মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির কামনার মনোভাব রাখা। অহমিকতা, প্রদর্শনেচ্ছা ও খ্যাতি অর্জনের মনোভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
৬. হালাল উপার্জন দ্বারা হজ করা। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ খরচ করে হজ করলে তা আল্লাহর নিকট কবুল হয় না।
৭.
নিষ্ঠাবান ও নেককার আলেমে দ্বীনকে সদরসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা। অর্থাৎ
আলেমে দ্বীনের সাথে থেকে হজের কার্যাবলী আদায় করা। ভাল মানের আলেম পাওয়া না
গেলে অভিজাতসম্পন্ন ফরহেজগার ব্যক্তির সঙ্গে থাকা।
৮. পরিবারের যাবতীয় খরচের টাকা পয়সা দিয়ে যাওয়া।
৯. হজের সফরে ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্য না রাখা।
১০. কোন ব্যক্তির আমানত থাকলে বা ধাবাকৃত বস্তু থাকলে তা ফেরত দেয়া।
১১.
সফরের পূর্বে পরিবারের লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এবং ….. বন্ধুদের কাছ থেকে
বিদায় গ্রহণ করা। তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করে ক্ষমা চাওয়া ও দোয়া কামনা করা।
আত্মীয়দের হক আদায় করা।
১২. হজের সফরের পূর্বেই হজ সংক্রান্ত মাসআলা মাসাইয়েল শিখে নেয়া ও চর্চার জন্য কিতাব-পত্র সাথে রাখা।
১৩.
বাড়ী থেকে বের হওয়ার আগে দু’রাকাত নামায আদায় করা এবং সফরের দু‘আ পাঠ করা।
বাড়ীতে ফেরার পরও দু’ রাকাত নামায আদায় করা এবং সফরের দুআ পাঠ করা। বাড়ীতে
ফেরার পরও দু’রাকাত নফল আদায় করা।
১৪. হজের সফরে কারো হাদীয়া তোহফার প্রতি লালায়িত না হওয়া। ছোট খাত নিজের খরচ নিজে বহন করা।
১৫. বেশী বেশী নফল ইবাদত ও আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকা। কুরআন তিলাওয়াত সহীহ চেষ্টা করা।
হজের প্রকারভেদ :
হজ তিন প্রকার, যথা
১। ইফরাদ
২। কিরান ও
৩। তামাত্তু।
১। ইফরাদ হজ :
মীকাত থেকে কেবল মাত্র হজ ইহরাম বেঁধে হজ করাকে ‘ইফরাদ হজ বলা হয়। এ ইহরামের মাধ্যমে ওমরা আদায় করা হয় না।
২। কিরান হজ :
কিরান
শব্দের অর্থ হচ্ছে, মিলিত করা, যুক্ত করা বা একত্রিত করা। একই সঙ্গে মীকাত
থেকে হজ ও ওমরার ইহরাম বেঁধে হজ করাকে ‘কিরান হজও বলে। অর্থাৎ একই ইহরামে
প্রথমে ওমরা করা অত:পর হজ আদায় করা।
৩। তামাত্তু হজ :
তামাত্তু
শব্দের অর্থ হচ্ছে উপভোগ করা, উপকৃত হওয়া বা ফায়দা হাসিল করা। হজের সফরে
মীকাত ইহরাম বেঁধে এবং ওমরার কাজ সম্পন্ন করার পর পুনরায় সে সফরেই ৮ জিলহজ
মক্কা থেকে হজের ইহরাম বেঁধে হজ করাকে তামাত্তু বলা হয়। এখানে ওমরা আদায়
করার পর ইহরাম খুলে স্বাভাবিক পোষাক পরা হয়।
মীকাত কি?
‘মীকাত’
শব্দটির আরবী। এর আভিধানিক অর্থ হলো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান। পবিত্র কাবা
সংশ্লিষ্ট হরম সীমানায় প্রবেশে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য ইহরাম ছাড়া যে স্থান
অতিক্রম করা জায়িয নয় শরীআতের পরিভাষায় সে স্থানকে বলা হয় মীকাত।
মীকাত তিন প্রকার :
১. আফাকী লোকদের মীকাত : অর্থাৎ যারা দূরবর্তী লোকদের মীকাত সমূহের বাহিরের সীমানায় সারা বিশ্বের যে কোন স্থানে অবস্থান করেন।
২. হিল্লী লোকদের মীকাতঃ, (যারা হরমের চৌহদ্দীর বাইরে হিল্ল এলাকায় বসবাস করেন)
৩. হরমী লোকদের মীকাতঃ (যারা হরম সীমানার ভিতরে অবস্থান করেন।
যারা
আফাকীদের মীকাত সমূহের ভিতরে অথচ হরম এলাকার বাইরে বসবাস করেন তাদের মীকাত
হচ্ছে সমগ্র হিল্ল এলাকা। তারা হজ ও ওমরার জন্য হিল্ল এর যে কোন স্থান
থেকে ইহরাম বাঁধবেন। যারা হারাম এলাকার ভিতরে বসবাস তাদের হজের ইহরামের
মীকাত হচ্ছে সমগ্র হারাম এলাকা এবং ওমরার ইহরামের মীকাত হচ্ছে সমগ্র হিল্ল
এলাকা। অর্থাৎ ওমরার জন্য হারাম এলাকার বাইরে যে কোন হিল্ল এলাকায় গিয়ে
ইহরাম বাঁধতে হবে।
আফাকী লোকদের মীকাত :
১. যুলহুলায়ফা বা বীরে আলী : এ স্থানটি মদীনাবাসী এবং এ পথে মক্কা মুআজ্জমায় আগমনকারী লোকদের মীকাত।
২. যাত্-ইরক : এ স্থানটি ইরাকবাসী ও এ পথে মক্কায় আগমনকারী লোকদের মীকাত।
৩. জুহফা : এ স্থানটি সিরিয়াবাসী এবং এ পথে মক্কায় আগমনকারীদের মীকাত।
৪. র্কন বা র্কনুল মানাযিল : এ স্থানটি নজদবাসী এবং এ পথে মক্কায় আগমনকারী দের মীকাত।
৫. ইয়ালামলাম : এ স্থানটি ইয়ামনবাসী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত সহ যারা এ পথে হজ করতে যায়, তাদের মীকাত।
ইহরাম:
ইহরাম হচ্ছে হজের তিন ফরযের অন্যতম যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে। হজ ও ওমরা উভয়ের জন্য ইহরাম আবশ্যক।
ইহরাম বাঁধার নিয়ম :
পরিষ্কার
পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয় সকল কাজ সম্পন্ন করে গোসল করতে না পারলে উযু করে
নিলে হয়। এর পর পুরুষগণ সেলাই করা কাপড় পরিবর্তন করে নিবেন। একখানা
সেলাইবিহীন চাদর পরিধান করে। আর একখানা চাদর গায়ে দিবেন। কাপড় সাদা হওয়া
মুস্তাহাব। এরপর ইহরামের নিয়্যতে দু’রাকাআত নফল নামায আদায় করবেন। প্রথম
রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর
সূরা ইখলাস পাঠ করা উত্তম। অন্য সূরা পাঠ করলেও হয়। এ নামায নিষিদ্ধ ও
মাকরূহ ওয়াক্তে যাতে আদায় করা না হয়। সালাম ফেরানোর পর মাথা উন্মুক্ত করে
কিবলামূখী হয়ে বসে বসেই হজ বা ওমরার নিয়্যত করবেন।
হজের ইহরাম হলে নিম্নরূপ নিয়্যত করা যায় অর্থ : হে আল্লাহ! আমি ওমরা আদায়ের নিয়্যত করছি। এ কাজ আমার জন্য সহজ করুন এবং কবুল করুন।
উল্লেখ্য,
আরবী ভাষায় নিয্যত করা জরুরী নয়। বাংলা ভাষায় করলেও নিয়্যত হয়। নিয়্যত
করার সাথে সাথে উচ্চ স্বরে তিনবার তালবিয়া পাঠ করবেন।
তালবিয়া:
তালবিয়া হল,
«لَبَّيْكَ
اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ
الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَك».
(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাক)।
‘আমি
হাযির, হে আল্লাহ, আমি হাযির। তোমার কোন শরীক নেই, আমি হাযির। নিশ্চয়
যাবতীয় প্রশংসা ও নিয়ামত তোমার এবং রাজত্বও, তোমার কোন শরীক নেই।
পুরুষদের
জন্য উচ্চস্বরে একবার তালবিয়া পাঠ করা ফরজ। একাধিকবার পাঠ করা সুন্নাত।
তিনবার পাঠ করা উত্তম। তালবিয়ার বিশেষ শব্দসমূহ যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে
তা উচ্চারণ করা সুন্নাত। অর্থাৎ উক্ত শব্দগুলো হুবহু উচ্চারণ করা ফরজ নয়।
উক্ত শব্দসমূহের স্থলভিষিক্ত অন্য কোন যিকর এর মাধ্যমেও তালবিয়ার ফারযিয়াত
আদায় হয়। মনে রাখতে হবে, যে কোন ভাষায় উচ্চারণ করে হোক বা মনে মনে ইহরামের
নিয়্যত করা আবশ্যক।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
সেলাইযুক্ত যে কোন কাপড় বা জুতা ব্যবহার, এক্ষেত্রে স্পঞ্জ সেন্ডেলের ব্যবহার করা।
মস্তক ও মুখমন্ডল (ইহরামের কাপড়সহ যে কোন কাপড় দ্বারা) ঢাকা,
পায়ের পিঠ ঢেকে যায় এমন জুতা পরা।
চুলকাটা বা ছিড়ে ফেলা,
নখকাটা,
ঘ্রানযুক্ত তৈল বা আতর লাগানো।
স্ত্রীর সঙ্গে সংগম করা।
যৌন উত্তেজনামূলক কোন আচরণ বা কোন কথা বলা।
শিকার করা।
ঝগড়া বিবাদ বা যুদ্ধ করা।
চুল দাড়িতে চিরুনী বা আঙ্গুলী চালনা করা, যাতে ছিড়ার আশংকা থাকে।
শরীরে সাবান লাগানো।
উকুন, ছারপোকা, মশা ও মাছিসহ কোন জীবজন্তু হত্যা করা বা মারা।
কোন গুনাহের কাজ করা, ইত্যাদি।
Copyright© Al Mabrur Hajj KafelaAll right reserved. Created by E-Vision Software Ltd